Thursday, July 29, 2021

First 8 stamps of Bangladesh । বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিট

বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত গাঢ় লাল, নীল ও বেগুনী রঙের ডাকটিকেট । মূল্য ১০ পয়সা। আমাদের ভূখণ্ড এবং দেশের পরিচয় বিশ্বকে জানানো ছিল এই ডাকটিকেটের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশের প্রায় মাঝ বরারর দিয়ে যাওয়া কর্কটক্রান্তি রেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকান্ডকে প্রেক্ষাপটে রক্তলাল ছাপের ওপর হলুদ লেখা ঢাকা ইউনিভার্সিটি গাঢ় সবুজ রঙের ডাকটিকেট। মূল্য ২০ পয়সা। ২৫ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করে এর ডিজাইন করা হয়। শিক্ষায়তনে হামলাকে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার হয়েছে । সবুজ জমিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেখাটির উপর লাল রক্তের ছোপ।
৩। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জাতি শীর্ষক হালকা বাদামী লেখা, ধূসর রঙের ডাকটিকেট। মূল্য ৫০ পয়সা। ৭৫ মিলিয়ন মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলার জনগন একত্রে সংগ্রামের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
৪। বাংলাদেশের মানচিত্রসহ জাতীয় পতাকা সম্বলিত সবুজ রঙের উপর লাল সূর্যের মধ্যে হলুদ বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা ডাকটিকেট। মূল্য ১ টাকা। জাতিয় পতাকাকে দেখানো হয়েছে, এখানে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা ব্যবহার করা হয়েছে। পতাকা অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের পরে মানচিত্র থেকে সরিয়ে একটু পরিবর্তন করানো হয়েছে।
৫। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে শতকরা ৯৮ ভাগ ভোট প্রদানের ঘটনাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ব্যালট বাক্সের প্রতীকের মধ্যে সাদা এবং মেজেন্টা রঙের ডাকটিকেট। মূল্য ২ টাকা। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিজয় এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাকে দেখানে হয়েছে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাঙালীর কাছে ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি বরং নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
৬। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলকে মনে রেখেই করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাসহ শিকল ভাঙার চিত্র। গাঢ় সবুজ ও নীল রঙের একটি ডাকটিকেট । মূল্য ৩ টাকা। ভাঙ্গা শিকল, বাঙালিকে তার নিষ্পেষণ ছেড়ে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৭। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সম্বলিত ডাকটিকেট। মূল্য ৫ টাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের এই অবিসংবাদিত নেতা তখন বন্দি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। এই ডাকটিকেটেই শুধুমাত্র ছবি ব্যবহার করা হয়েছে বাকি সব কয়টিতেই ডিজাইন করা হয়েছে।
৮। ‘বাংলাদেশকে সমর্থন করুন’ শীর্ষক মেজেন্টা রঙের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র। মূল্য ১০ টাকা। 'Support Bangla Desh', এই ডাকটিকেটটি ছিল সাদামাটা, কিন্তু এর বার্তাটি ছিল সবেচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। বাংলাদেশের সাহায্য দরকার, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক, এই ডাকটিকেট সেই বার্তাটিই বহন করেছে।
বাংলাদেশের ডাকটিকেট প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯৭১ সালের ২৬শে জুলাই, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন অবস্থায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি বর্হিবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ ও বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশে ডাকটিকিট প্রচলন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই লক্ষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য জন স্টোনহাউসের পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৭১-এর এপ্রিলের শেষদিকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ডাকটিকিট প্রকাশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সে অনুযায়ী স্টোনহাউস যুক্তরাজ্য প্রবাসী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি গ্রাফিক শিল্পী অধ্যাপক বিমান মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক প্রস্থ ডাকটিকিটের নকশা তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নির্দেশ মতো বিমান মল্লিক বিনা পারিশ্রমিকে ডাকটিকিটের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা, নকশা তৈরির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে নিরাপরাধ বাঙালি জনসাধারণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচারের কাহিনী শিল্পীর জানা ছিল। তাই সেই প্রস্তাব ও দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের স্বাধিকার সংগ্রামে সাধ্যমতো সাহায্যদানের সুযোগটি গ্রহণ করেন। বিমান মল্লিক অধ্যাপনার কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে আটটি ডাকটিকিটের নকশা তৈরির কাজ সম্পন্ন করেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এক স্মৃতিচারণে বলেছেন, 'এই ডাকটিকিট প্রকাশের ফলে মুজিবনগর সরকার যে বাংলাদেশ পরিচালনা করছে, এই ধারণা বিদেশে সমর্থন লাভ করে।' দেড় মাসের চেষ্টায় বিমান মল্লিক তৈরী করলেন বাংলাদেশের প্রথম ৮টি ডাকটিকিটের নকশা। কাজটা খুব সহজ ছিল না কারণ বাংলাদেশ সরকারের কোন নির্দেশনা বা concept না থাকায় গবেষণার কাজটিও করতে হয় বিমান মল্লিককেই। যাই হোক নকশা তো হল এবারে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পেতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে ব্রিটিশ সাহায্য সংস্থা ‘War on Want’ এর প্রধান ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ কলকাতায় এলেন। একটিতে বাংলাদেশের পতাকা, দুটিতে মানচিত্র, একটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ত ঝরার প্রতীক, একটিতে ব্যালট বাক্স, একটিতে ছেড়া শেকল, একটিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং একটিতে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর প্রতীক সম্বলিত ৮টি ডাকটিকিটের মূল নকশার অনুমোদন দিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রেস থেকে ডাকটিকিট ছাপা হল স্টোনহাউসের সহায়তায়। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ২৬ জুলাই House of Commons এর হারকোর্ট রুমে সাংবাদিকদের সামনে উন্মোচন করলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ৮টি ডাকটিকিট আর ফার্স্ট ডে কভার। ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই ঐ ৮টি ডাকটিকিট একযোগে লন্ডন, মুজিবনগর ও কলকাতাস্থ বাংলাদেশ মিশন থেকে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক বিজয়। আগস্টের এক তারিখ লন্ডনের ট্রাফলগার স্কয়ারে 'Stop Genocide, Recognise Bangladesh' নামের একটি সভা করা হয়, সেখানে স্টোনহাউজ, আবু সাঈদ চৌধুরী, বহু বাংলাদেশি, ভারতীয় সাধারণ মানুষের সাথে যোগ দেন বিমান মল্লিক। তিনি সেখান থেকে উঁচিয়ে ধরেন বাংলাদেশের জন্য তার ডিজাইন করা আটটি ডাকটিকেট। জন স্টোনহাউজের চেষ্টায় বিভিন্ন দেশে এই ডাকটিকেটগুলো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের নাম প্রচারিত হতে থাকে, দলে দলে সংগ্রাহকরা আসতে থাকে ডাকটিকেট সংগ্রহের জন্য। ব্রিটেনে প্রথম দিনেই ২৩ হাজার ডলারের ডাকটিকেট মানুষ সংগ্রহ করে। আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের জন্য ব্যাপারটি নাক কাঁটা যাবার অবস্থা। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক পোস্টাল ইউনিয়ন’ এর কাছে জানানো হয় যে এই ডাকটিকেটের সাথে কোনো দেশের সংযুক্তি নেই, এটি ভিত্তিহীন। বাংলাদেশের অল্প কিছু মুক্তাঞ্চল ছিল, সেই এলাকায় থাকা পোস্ট অফিসগুলোকে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। যদিও বাংলাদেশের ডাক যোগাযোগ ততদিনে ভেঙে পড়েছে, ধরতে গেলে কোনো অবকাঠামোই মুক্তাঞ্চলে কাজ চলার মতো অবস্থায় নেই। তারপরেও এই ডাকটিকেট ইউরোপীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে কূটনৈতিক, সংগ্রাহক, প্রবাসী বাঙালী এবং ভারতীয়দের হাতে হাতে। অভিযোগ ধোপে টিকলো না। এক্ষেত্রেও পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিঁড়ে দুই বিদেশী জন স্টোনহাউস ও বিমান মল্লিকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পেলো তার প্রথম ফিলাটেলিক পরিচয়, ৮টি ডাকটিকিট। বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ডাকটিকেটগুলি বিশেষ ভুমিকা পালন করেছিল। ২০১২ সালে বিমান মল্লিককে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া হয় এবং ‘Friends of Liberation War Honour’ এ ভূষিত করা হয়।

No comments:

Post a Comment

Bangladesh stamps exhibition 2023

 Join the Amazing Stamp Collecting Community at BDPEX 2023 #stamps Join us as we delve into the fascinating world of stamps! Our Stamp Exhib...